ঐন্দ্রিলা বরাবরই স্বাধীনচেতা, স্পষ্টভাষী মেয়ে। ছোটবেলায় ঠাকুমার মুখে বিয়ের গল্প শুনতে শুনতে বড় হলেও, বাস্তব জীবনে বিয়েকে সে কোনোদিন “রঙিন স্বপ্ন” হিসেবে দেখেনি। তার কাছে বিয়ে মানে ছিল পারস্পরিক বোঝাপড়া, ভালোবাসা আর সম্মান। কিন্তু যখন পরিবার থেকে সাগ্নিকের সঙ্গে বিয়ের প্রস্তাব এল, এবং দুজনের মধ্যে বোঝাপড়া গড়ে উঠল, তখন সে নিজেই সম্মত হয়। তবে একটা শর্তে—বিয়েটা হবে নিজের মতো, নিজের শর্তে।
কিন্তু বিয়ে মানে শুধু দু’জন মানুষ নয়, সঙ্গে জড়িয়ে থাকে সমাজের হাজারটা চোখ, নিয়ম, রীতিনীতি—যার অনেকটাই আজও যুগযুগান্তরের ধোঁয়াটে ছাঁচে তৈরি।
ঐন্দ্রিলার বিয়ের দিন ঠিক হলো এক শরতের দুপুরে। কোনো মহাভোজ, রাতভর আয়োজন নয়। সে চেয়েছিল একেবারে সাদামাটা, দুপুর ১২টার সময় রেজিস্ট্রি অফিসে বিয়ে হবে। তারপর কাছের কিছু আত্মীয়স্বজন আর বন্ধুদের নিয়ে একটা ছোট লাঞ্চ পার্টি, ব্যস।
তবে ঐন্দ্রিলার পরিবার এতটা সরল নয়। তারা চেয়েছিল অন্তত কিছু রীতি থাকুক—‘মঙ্গলস্নান’, ‘গায়ে হলুদ’, ‘নতুন শাড়ি পরে বিয়ে করা’—এসব বাদ দেওয়া যায় না। ঐন্দ্রিলা নিজের সীমা ঠিক করে দিল, “যা করবো, নিজের মতো করবো, কাউকে কষ্ট দেবো না, কিন্তু নিজেকেও ভাঙবো না।”
বিয়ের আগের দিন:
সকালে নিজের ছোট্ট ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে, গাছের টবে জল দিচ্ছিল ঐন্দ্রিলা। মা এসে বলল,
– “আজ সকালেই হলুদ লাগিয়ে দিই?”
– “মা, হলুদ লাগাবে, কিন্তু আমার বাথরুমে, নিজের মতো করে। ফোটোশ্যুট লাগবে না।” মা মুচকি হাসলেন। জানতেন, এই মেয়েকে জোর করে কিছু করানো যায় না।
সন্ধ্যেবেলা বন্ধুদের সঙ্গে ছাদে বসে মিউজিক, গল্প, হালকা নাচগান—এই ছিল ঐন্দ্রিলার ‘আইবুড়োভাত পার্টি’। না ছিল লালপেড়ে শাড়ি, না কোনো ঢাকঢোল। পাতে ছিল মুগডাল আর লাউ চিংড়ি, সাথে মিষ্টি দই। সবার ভালো লেগেছিল, কারণ সবাই জানত—এটা ঐন্দ্রিলার স্টাইল।
বিয়ের দিন:
ভোর ৫টায় উঠে সূর্য নমস্কার দিয়ে দিন শুরু করলো ঐন্দ্রিলা। না, কোনো পুরোহিতের কলস জলের অনুষ্ঠান নয়—নিজের রুটিন মতো যোগা, তারপর হালকা নাস্তা। চা, টোস্ট আর একটুকরো পনির—সকালটা ছিল স্বাভাবিক।
১০টায় বন্ধু সুহিতা এসে চুল বাঁধলো, হালকা সাজ দিলো। ঐন্দ্রিলা পরেছিল একটা হালকা তসর শাড়ি, কপালে একটা ছোট্ট টিপ। গলায় একটা ছোট সোনার লকেট। কেউ বললো না, “নতুন বউ কি একটুও সাজে না?” কারণ সবাই জানত, ঐন্দ্রিলার বিয়ে মানে লোক দেখানো নয়।
রেজিস্ট্রি অফিসে যখন সাগ্নিক এল, ওর হাতে ছিল এক গুচ্ছ সাদা গোলাপ। বিয়ে হল সোজাসাপ্টা। দুই পরিবারের সাক্ষী, কাগজে সই, হাসি মুখে ফটো, ব্যস।
বিয়ের পর:
একটা ছোট রেস্টুরেন্টে দুপুরের খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। ঐন্দ্রিলা জানত, বিয়ের দিন খাওয়াটাও জরুরি।
তাই দুপুরে ছিল প্রিয় খাবার—ভাত, পনির, মটন, চাটনি, মিষ্টি। পেট ভরে খেয়ে সে বলল, – “আজকে আমি নিজে নিজের দায়িত্ব নিই—সুখে থাকবো।”
সন্ধ্যেবেলা শ্বশুরবাড়ি যাওয়ার আগে ঐন্দ্রিলা স্পষ্ট বলেছিল, “আমি ক্লান্ত, রাতটা আমার নিজের ফ্ল্যাটে কাটাবো। কাল সকালে যাবো তোমাদের বাড়ি।”
অনেকে মুখ ঘুরিয়ে বলেছিল, “নতুন বউ ঘরে ঢুকছে না, এ কেমন নিয়ম?” কিন্তু কেউই জিজ্ঞেস করেনি ঐন্দ্রিলা সারাদিন কেমন আছে, খেয়েছে কি না, বিশ্রাম নিয়েছে কি না।
পরদিন সকালে, ফ্রেশ হয়ে, ফুলশয্যার শাড়ি নয়—সাদা কুর্তা পরে ঐন্দ্রিলা গেল শ্বশুরবাড়ি। সেখানে ছিল না কোন ধুন্ধুমার বরণ, ঢাকঢোল বাজনা। শুধু একবাটি দই আর মিষ্টি নিয়ে শাশুড়ি মৃদু হেসে বললেন, – “আমার মেয়ে এভাবেই আসবে জেনেই তো তোমায় পছন্দ করেছিলাম।” ঐন্দ্রিলা একটিবার হাসলো। মনে মনে বলল,
– “রীতি মানলে নয়, ভালোবাসলে ভালো হওয়া যায়।”
শেষ কথাঃ
ঐন্দ্রিলার এই বিয়েতে কোনো ‘ফুলশয্যার তাড়া’ ছিল না, কোনো ঠোঁট কামড়ানো টিপ্পনী ছিল না, ছিল না ক্লান্তির মধ্যে শাড়ির আঁচল নিয়ে লজ্জায় মুখ লুকানো দৃশ্য। কারণ সে জানত, বিয়ে মানেই আত্মবিসর্জন নয়। নিজেকে ভালোবেসে, নিজের স্বার্থে দাঁড়িয়ে থেকেও সম্পর্কটাকে সম্মান জানানো যায়।
এই গল্প এক অন্যরকম বিয়ের, যেখানে ‘রীতি’ আছে, কিন্তু ‘রেওয়াজে’ নয়, হৃদয়ে।
এটা ঐন্দ্রিলার গল্প, যারা ভবিষ্যতে বিয়ের মানে শুধুই ‘সহ্য’ নয়—ভালোবাসা বুঝে নেবে।
আর সমাজ? সে ধীরে ধীরে বদলাবে, একেকটা ঐন্দ্রিলাকে দেখে।
এই গল্পটি কেমন লাগলো সেটা কমেন্টে লিখে জানান। আমাদের ভালো লাগবে। আপনার একটা ছোট্ট কমেন্ট, আমাদের লেখার উৎসাহ ।